Monday, 21 September 2015

হাওড়া থেকে কালকা, : একটি সমাজতাত্বিক আলোচনা

পিছিয়ে পরা রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ যে একটি, সে বিষয়টা জানা সবারই. তবে জনবহুল রেল স্টেশন হাওড়া থেকে কালকা মেলে উঠলে টেম্পারটা টের পাওয়া যায়. এমনিতেই রাজধানী যায়, তার ওপর বাঙালির প্রিয় বরফের জায়গা সিমলা মানালী যাবার জনপ্রিয় ট্রেন. তাই, শ্রেনীহীন মানুষের উপস্থিতিতে ট্রেন বাঁশী বাজিয়ে যাত্রা শুরু করে.
অখণ্ড বিহারের বিভিন্ন রাজ্যের ওপর দিয়ে গেলে ট্রেনের রংটাই বদলে যেতে থাকে. ভারতবর্ষ নামক বিশালাকার বিল্ডিংয়ের বহু পুরাতন চুন সুড়কির গাঁথনিটা দেখা যায়.সপ্ন দেখার মাঝে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়. অপুষ্টির বোমা, জাত পাতের গুলি, নারী দুর্দশার কামান - সবকিছু একসাথে এক অদ্ভুত সমাজের ছবি তুলে ধরে.
একটু নজর দিলেই বোঝা যায়, এই মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকালে কিছুতেই নীতিশ, লালু কিংবা রাবরীকে খুঁজে পাবে না, বরং সব্বাই দশরথ মাঝির প্রতিনিধি যারা দিশেহারা হয়েছে বটে, কিন্তু দম্ আছে খালি পেট নিয়ে আরো একটা পাহাড় কেটে দিতে পারার.
রুক্ষ মাটি ও খড়খড়ে আবহে এরা পিছিয়ে পড়া ভারতবাসী, মহিলারা চকমকে কাপড়ের ঘোমটা টেনে রুগ্নতা ঢাকে, বাবার বয়সী স্বামী এদের জীবনসঙ্গী, ধুলোর সাথে গড়াগড়ি দেওয়ায় এদের গরিবী- সবকিছু নিয়েই এরা গর্বিত বিহারী.
ট্রেন এগোলেই এদের আরেক সঙ্গী উত্তর প্রদেশ. খুব বেশী পার্থক্য করা যাবে না. নোংরা রাস্তা ঘাট, পচা খাল, পশুর মতো মানুষের বেঁচে থাকা. তবে, পশ্চিমবঙ্গের ও বিহারের সাথে একটা বড় পার্থক্য আছে এই রাজ্যটির, তা হলো ধর্মীয় বিবাদ. সেটাই মনে হয় এই রাজ্যের সব থেকে বড় রোগ. কারণ, বিবেকানন্দ শিকাগোতে বক্তৃতা দেবার সময় ভারতবাসীর নেতিবাচক দিকগুলি উঁচু গলায় বলেছিলো, তার মধ্য কোথাও এমন বিবাদের কথা বলেননি.
ধীরে ধীরে যখন দিল্লী ঢুকবে ট্রেন, তখন চিত্রটা কিছুটা বদলে রাজধানী গন্ধ আসবে, কিন্তু সেই তৃতীয় বিশ্বের প্রমাণ থেকেই যায়.
কোনক্রমে দিল্লী পেরিয়ে হিমাচল প্রদেশে ঢুকতে ঢুকতেই নতুন ভারতের গন্ধ পাওয়া যাবে, যে গন্ধ মিলবে পার্লামেন্টের ঘরে, যে গন্ধ মিলবে পার্টি ওফিসের প্রেস রুমে, -এখানে শান্ত ভারতবর্ষ, এখানে চামড়ায় ঠান্ডা হাওয়া লাগে, এখানে ক্রিমিনাল সাংসদরাও উঁচু মাপের ভারতীয়, এখানে সংবিধান বলে একটা বই আছে, এখানে রাইট ট্যু ইনফরমেশন বলে একটা ব্যপক আইন আছে, এখানে ফেমিনিস্টরা লড়াই করেন সিংগল মাদারের জন্য, এখানে রাজনীতি নিয়ে বই লেখা হয়. বরফ ও ঠান্ডা ভুলিয়ে দেয় বাকি ভারতবর্ষের কথা, ভাবতে শুরু করি কিভাবে বাথটবে শুয়ে সুখ পাওয়া যাবে সব থেকে বেশী.
কালকা মেল ট্রেনটি শুধু একটা যোগাযোগের মাধ্যম নয়, আমাদের কাছে ভারতবর্ষ চিনে নেবার এক জার্নি যা পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে, বিহার - উত্তর প্রদেশ, দিল্লী,সব কিছু দেখিয়ে  সবশেষে আবার এসবকিছু ভুলিয়ে দেয় হিমাচল প্রদেশে. ভুলবো তো সবই, শুধু মনে রাখা প্রয়োজন ঠান্ডা ও বরফ যতই আমাদের সুখের পর্যায়কে উঁচুতে নিয়ে যাক, ফিরতে হবে বাড়ি আর দেখতে হবে সেই উত্তর প্রদেশের মানুষ, বিহারের আবহাওয়া এবং ফিরে গিয়ে সেই পশ্চিমবঙ্গের নিত্যদিন. আরও একবার এঁকে ফেলবো ভারতবর্ষের সামাজিক রূপরেখা.

Sunday, 20 September 2015

সমাজতত্ত্ব পাঠে ইংরিজী ভাষা

সমাজতত্ত্ব বিষয়টি পৃথক পৃথক সমাজের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনা হয়. এমনকি আলাদা ভাষা ভাষী মানুষের কাছেও এর আলোচনার ধরন বদলে যায়; তবে আমরা বাঙ্গালীরা কেন শুধু বাঙ্গলা ভাষাতে এর চর্চা করবো না ???
প্রশ্নটা খুব সাধারণ এবং প্রাসঙ্গিক...
আমাদের দেশে এত বাঙ্গালী সমাজতাত্বিক থাকায় এই দাবীটি খুব স্বাভাবিক.
কিন্তু, তা সম্ভব নয় বলেই, আমরা বাঙ্গলা সমাজতত্ত্ব চর্চার পাশাপাশি ইংরিজিতে বিষয়টির চর্চা করবো, কারন নিম্নলিখিত :-
1) নবীন বিষয় হিসেবে এর বিস্তার এতটাই কম যে, একটা বিস্তৃত আলোচনা ও চর্চার জন্য আমাদের ছাত্র ও পণ্ডিতের সংখ্যা এতটাই কম যে, সঠিকভাবে করার জন্য অন্য ভাষার পণ্ডিতদের ডাকতে হয়. এই সমস্যা কিন্তু ইতিহাস বা ভূগোলের নেই. তাই, একটা মাধ্যম হিসেবে ইংরিজি ব্যবহার করতে হয়.
2) বিদেশী বইগুলো এখনো সঠিক ও উন্নতমানের অনুবাদ হয়নি, ফলতঃ আমাদের সঠিক পড়াশুনার জন্য সরাসরি ইংরিজি বই পড়তে হবে. যেমন, কার্ল মার্কসের বই জার্মানী ভাষায় পড়ার দরকার নেই, উন্নতমানের অনুবাদ ইংরিজিতে আছে.  কিন্তু বাংলার অনুবাদ ভালো নেই.
3) সমাজতত্ত্ব খুব বেশী প্রাত্যহিক দিনকালের সাথে যুক্ত এবং এখনকার ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ইংরিজিতে পড়াশুনার জায়গা প্রস্তুত করে রাখা উচিত.

কিন্তু, কেন শুধু ইংরিজিতে সমাজতত্ত্ব পড়ব না ???
কারন, সমাজতত্ত্ব পড়া মানে এর বুলি আওড়ানো ও পয়সা ইনকাম নয়, আমাদের দায়িত্ব  সমাজকে নিয়ে ব্যাখ্যা করা ও ভাবা এবং সামাজিক সমস্যা গুলো নিয়ে সমাধানের পথ দেখানোতে সাহায্য করা.
তাই, নিজস্ব ভাষাতে সমাজতত্ত্ব না জানলে, আমরা কখনই নিজের সমাজতত্ত্ব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যাগুলো নিজের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারব না.

সর্বশেষে, এটা বলা যায় যে ইংরিজিতে সমাজতত্ত্ব পড়ে, চর্চা করে আমাদের মূল উদ্দেশ্য বাংলা ভাষায় সহজ সমাজতত্ত্ব নিজের মানুষের কাছে পরিবেশন করা.
আজ যদি আমরা এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি, তবে পরবর্তী প্রজন্ম আরও সহজ করে সরাসরি বাংলায় সমাজতত্ত্ব পড়তে পারবে হয়তো.

Friday, 18 September 2015

ক্ষমতায়ন ও সশক্তিকরণ

পিছিয়ে পরা মানুষের দল তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লড়াই চালাচ্ছে। হঠাত, করে এই প্রবণতাই সমাজে অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।
মাতৃভূমি নামক ট্রেনকে মহিলারা নিজেদের আয়ত্তে করে রাখা , গুজরাটে প্যাটেল সম্প্রদায়ের অনগ্রসর হওয়ার দাবী, বিরোধী দলের হরতাল-বিক্ষোভ-বনধ ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের প্রমান করা। 
সর্বত্র পিছিয়ে পরা মানুষের নিজেদের প্রমানের জন্য শক্তিপ্রদর্শন
মনে রাখতে হবে, শক্তি প্রয়োগ করে নিজেদের ক্ষমতাশালী প্রমান করা যায়না। যদি তাই যেত, তবে সর্বদা ছড়ি ঘোরানো স্কুল টীচার-রাই সব থেকে শক্তিশালী হত. 
আর যারা সর্বদা নিজেদের 'জনগনের সেবায় রত', 'পাবলিক সার্ভেন্ট' ইত্যাদি বলা আমলা ও রাজনীতির ব্যক্তিরা ক্ষমতাশালী হত না। 
পিছিয়ে পরা মানুষকে এগিয়ে আসার জন্য সমাজে তাদের গুরুত্ব কে তুলে ধরতে হবে এবং নিজেকে নিজের প্রাসঙ্গিকতা গড়ে তুলতে হবে।