Thursday, 10 December 2015

কান্নার রং বদল

জানি : মতামত দিয়ে কিছুই বদলে দেওয়া যায়নি কখনো!
তবু : এই লেখাটা লিখতেই হচ্ছে,
কোটি কোটি মানুষের মন জয় করা, নায়ক সলমন খানকে ঘৃণা করার জন্য যুক্তি সাজাতে হয়না, শুধু  মানুষ(গাড়ির তলায় চাপা পড়া) কিংবা নিদেনপক্ষে জানোয়ার(হরিণ) হলেও হয়!! যদি তাও না হয়, তবে তো বলতে কোন বাঁধা নেই "আরে ভাই, আমি সিনেমা দেখি! ওর শিল্পী সত্তাকে কুর্নিশ জানাই! আমি ওর ফ্যান! কি দেখতে! কি নাচে! উফ্, হিরো".

বেকসুর খালাস হবার আনন্দে পার্টি হবে, মদ্য পান হবে, তারপর গাড়ি চালাতে বেড়াবেন সলমন!!! ওই গাড়ির তলায় কে কে আসবে, তা নিজেরাই ঠিক করে নাও. ঠিক আছে ???

নাহলে, সলমন খানের কোন দোষ থাকবে না কিন্তু!!
তোমরা যদি সাহায্য না করো, সলমন খান নিজের ইচ্ছে মতো ঘুমন্ত মানুষ পিষে দিয়ে এমনভাবে মানুষ মারবে, যেন কোন সিনেমার মারকুটে সিন!!!
আর, এই কাজের জন্য আদালত ডাকবে এবং সেই আদালত থেকে কেস জিতে নায়ক এমনভাবে বেরিয়ে আসবে যেন সিনেমার শেষ সিন! দর্শক জেতার আনন্দে কাঁদবে!

কেউ কেউ আবার কাঁদবে গাড়িতে চাপা পড়েও,  আদালতে মিথ্যেবাদী প্রমাণিত হয়ে!!!

আমরা আদালত না, আমরা প্রশাসন না কিংবা আমরা পুলিশ না !!!
কিন্তু আমরা প্রতিক্রিয়াশীল!!! আমরা কিছু খারাপ দেখলে কোথাও না হোক, মনের "পুলিশ" দিয়ে গ্রেপ্তার করে ফেলতে পারি মনে মনে! নিজের আত্ম-প্রশাসন ওই খারাপকে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী হতে পারে এবং বিবেকের আদালত তার বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি দিতে পারে!!
একটাই শাস্তি - REJECT
নিজের জীবনের ভালো লাগার লিস্টে সলমন-এর কোন কিছু থাকবে না!!

Wednesday, 2 December 2015

জানালার শহর

শহরের উপকণ্ঠে আমার শহর,
সূর্য ওঠার কয়েক ঘন্টা পরেই জেগে ওঠে!
রাতের নিশ্চুপ একাকীত্ব গুলো,
নিজেকেই নিজে হারিয়ে ফেলে এই সকালবেলা!
বিছানার কোল ছেড়ে একটু সরে,
ঘুমভাঙা চোখে নিজের থুতনি রাখি জানলায়,
চোখের দৃষ্টি চলে যায় রাস্তায়,
ঘাড় কাঁত করে তাঁকিয়ে থাকি রাস্তার দিকে!
ওরা বুঝি অন্য গ্রহের জীব,
মানুষের থেকে চলমান গাড়ির সংখ্যা বেশী!
পিঁপড়ের মতো মানুষ গুলো,
আর দেশলাই বাক্সের মতো গাড়ি গুলো নড়ছে!
থেমে থাকতে নেই ওদের কারো,
ওদের গতি আমার হৃদপিন্ড থেকেও বেশী!
ছুটতে থাকা এই শহরের থেকে,
আমি ছুটে পালাতে চাই দূর থেকে আরো দূরে!
আমি গতিহীন এক নিশ্চুপ ভাবনা,
আমার থমকে যাওযাই জন্ম দেয় ভাবনার গতিকে!
তবু শহরের ব্যস্ততা বিলীন হয়,
আমার ইচ্ছার চৌকাঠের একটু দূরে!

Thursday, 26 November 2015

গ্রাম সভা ও তার সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

সময়ের সাথে সাথে আমাদের সমাজ যতই জটিল ও সমস্যাযুক্ত হয়ে উঠছে , মানুষ ততটাই দ্রুততার সাথে এইসব সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হয়ে উঠছে। এই উদ্যোগের উজ্জ্বল ফল হল গ্রামীণ ভারতে গ্রাম সভার আয়োজন। কল্যাণকারী রাষ্ট্র ভারতবর্ষের সরকার যেসব প্রকল্প গ্রামীণ মানুষের উদ্দেশ্যে চালু রেখেছে তার সচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও ফলপ্রসূতা নিশ্চিত করতে সাধারন গ্রামবাসীকে গ্রাম পঞ্চায়েতের মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়াই হল গ্রাম সভা। ঠিক যেন এক তৃনমূল স্তরের গ্রামীণ পার্লামেন্ট , যেখানে আলোচনা, তর্ক বিতর্ক, অভিযোগ, আদেশ, প্রস্তাব পেশ হয় খোলা মেলা ভাবে। অর্থাৎ গ্রাম সভার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল নিম্নলিখিত –

১/গ্রামের আধিকাংশ মানুষের ধর্ম-লিঙ্গ-রাজনীতি নির্বিশেষে উপস্থিতি
২/আলোচনা হবে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া বা চালু প্রকল্পগুলির অগ্রগতি সম্পর্কে
৩/ভবিস্যতে নতুন নেওয়া হবে যেসব সরকারি প্রকল্প , তার প্রস্তাব গ্রহন
৪/ সাধারন মানুষের অভিযোগ-উপদেশ শোনা এবং গ্রাম পঞ্চায়েত ও জন প্রতিনিধি দ্বারা স্পষ্ট প্রত্তুত্তর
৫/সম্পূর্ণ সভাটির প্রতিটি পদক্ষেপকে লিপিবদ্ধ করা হয় যাতে তার ভিত্তি্তে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহন করতে বাধ্য থাকে।

ভারতবর্ষের অধিকাংশ অংশটি গ্রামীন, তাই জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর পাখির চোখ ছিল গ্রামীন ভারতের উন্নয়ন। এমনকি স্বাধীনতার পরের ভারতে বিভিন্ন উন্নয়নের ভাবনা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সহ সমস্ত ক্ষেত্রেই প্রকল্প রুপায়নকারীরা গুরুত্ব দিয়েছে এই গ্রামীণ ভারতকেই। অর্থনৈতিকবিদরা শহুরে ভারত ও গ্রামীন ভারতের বিপরীতমুখী চরিত্রকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, গ্রামীণ ভারত সর্বদা বঞ্চিত থেকেছে। প্রতিটি বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকার গ্রামীন উন্নয়নে ক্রমবর্দ্ধমান অর্থ বরাদ্দ করলেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। গ্রামীণ ভারতের স্বার্থে চালু হওয়া মূল প্রকল্পগুলি হল- এম জি এন আর ই জি এ , আই এ অয়াই , আর এস বি অয়াই , এন এস এ পি, সহায়, স্বচ্ছ ভারত কর্মসূচী ইত্যাদি।

সরকার থেকে একটি মানুষের , পরিবারের সমস্ত ভাবে বেচে থাকার রসদ জুগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবুও সাধারন মানুষের কাছে এই প্রজ্বলিত আলোর শিখা পৌছাতে ব্যর্থ হয়েছে। স্বাধীনতার পর ৬৮ বছর পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ গ্রামীন ভারত কর্মহীন, গৃহহীন , শিক্ষাহীন, গরীব, চিকিৎসার সুযোগ পেতে ব্যর্থ। কারন হিসেবে বলা যায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে-
১/ দুর্নীতি রোধ করতে না পারায় প্রকল্পগুলিতে খরচ হয়েছে, কিন্তু পরিষেবা দেওয়া যায়নি
২/ পরিকল্পনার ভুল বিন্যাস সরকারী প্রকল্পকে দিশাহীন করেছে।
৩/ সাধারন মানুষকে প্রকল্প সম্পর্কে সঠিকভাবে জানানো যায়নি, ফলে তারা এগিয়ে আসেনি।
৪/ প্রকল্প রুপায়নকারী সংস্থা, যথা-গ্রাম পঞ্চায়েতর সদিচ্ছার অভাব থাকায়, প্রকল্পগুলি ব্যর্থ হয়েছে।
৫/ সাধারন মানুষের মতামত জানা বা শোনা হয়নি যা যেকোনো প্রকল্পের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হতে পারতো।
এইসব দিকগুলি মাথায় রেখে সমস্যা সমাধানের যে চেষ্টা বহুদিন ধরে চালাচ্ছিল পরিকল্পনা রুপায়নকারীরা , তারই ফল হল গ্রাম সভা।

স্বাধীনতার পর গ্রামীন সমাজের উন্নয়ন ও এই উন্নয়নের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য গ্রাম সভা চালু হওয়া – গোটা বিষয়টির সমাজতাত্ত্বিক ব্যখ্যা করতে হলে, দুটি দিক উঠে আসে যা গ্রাম সভার আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

গ্রাম সভা হল গোটা সমাজ ব্যবস্থার একটি অঙ্গ , কারন ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রয়েছে লোকসভা যার মধ্যে ভারতের সমাজ পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর, রাজ্য গুলিতে বিধানসভা আছে যেখানে রাজ্য পরিচালনার দিশা নির্দিষ্ট করা হয়। সর্বশেষে গ্রামের গ্রাম সভা রয়েছে যেখানে ওই নির্দিষ্ট গ্রামটির উন্নতির বিষয়ে আলোচনা করা হয়। অর্থাৎ সাংসদ, বিধায়কদের মতই গ্রাম সভার সদস্য হল সাধারন গ্রামবাসী। 

গ্রামসভার ঐতিহাসিক উৎসটি যদি সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয় তবে বোঝা যাবে যে দীর্ঘ দিনের বহু ভাবনার ফলে এই গ্রাম সভার উৎপত্তি। সমাজের মূল বৈশিষ্ট্যই হল পরিবর্তনশীলতা। সারা পৃথিবীতে পরিবর্তনশীলতার উদাহরন হিসেবে সর্বপ্রথম ফরাসী বিপ্লব ও শিল্প বিপ্লব হয়েছিল। এইসব বিপ্লবের কোলেই জন্ম নিয়েছিলো সমাজতত্ত্ব বিষয়টি, যার পিতা অগাস্ত কোঁত। কিন্তু ভারতে এই পরিবর্তনশীলতার প্রথম উল্লেখযোগ্য উদাহরন হল ব্রিটিশের উপনিবেশ স্থাপন। যার ফলে রাজা ও রাজার সাম্রজ্য ব্যবস্থাটি বদলে যেতে থাকে জমিদারী ব্যবস্থায়। এই জমিদারী ব্যবস্থার অবসান ঘটে পরবর্তীকালে, অর্থাৎ স্বাধীনতার কিছুবছর পর। মাঝের সময় নকশাল সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটে। বর্তমানে পৃথিবীর বৃহত্তম গনতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে ভারতবর্ষের নাম গৃহীত হয়েছে। একটু লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, সবগুলি সমাজের ব্যবস্থাই বা সমাজের অবস্থাই ব্যর্থ হয়ে অন্য ব্যবস্থা বা অবস্থাতে পরিবর্তিত হতে বাধ্য হয়েছে। আর সবকটির মূলত একটিই কারন- সাধারন মানুষের কণ্ঠ রোধ করেছে ওই ব্যবস্থাগুলি। আর এই জায়গা থেকেই গ্রাম সভার ভাবনা শুরু। বর্তমানের ভারতবর্ষের প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা তথা গনতন্ত্রের ব্যবস্থার মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান আছে, বিশাল পুলিশ বাহিনী আছে, সক্রিয় ও সহজলভ্য আইন ও আদালত আছে। মানুষের অধিকারের কথা মাথায় রেখে কর্ম সুনিশ্চিতকরন আইন, শিক্ষার অধিকার আইন, খাদ্য সুরক্ষা আইন, তথ্য জানার অধিকার আইন, ক্রেতা সুরক্ষা আইন ইত্যাদি প্রচলিত আছে। তবুও আমরা জানি বেকার সমস্যা, শিক্ষাহীনতা, অনাহার, বিচারের সুযোগ না পাওয়া, আমাদের দেশের সাধারন চিত্র। তাই সরকারের দায়বদ্ধতা ও মানুষের কণ্ঠের গুরুত্বকে সুনিশ্চিত করতে গ্রাম সভার ভাবনা।

উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও গ্রাম সভার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজন। সমাজতাত্ত্বিকের উন্নয়ন বিষয়টিকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। পূর্বে উন্নয়নের ধারনা ছিল পরিকাঠামো অর্থাৎ চওড়া রাস্তা, উঁচু ফ্লাই ওভার, বিশাল অট্টালিকা ইত্যাদি। কিন্তু পরবর্তী সময় পরিষেবার বিষয়টি সমাজের উন্নয়নে যুক্ত হয়। সরকার প্রদত্ত পানীয় জল, শিক্ষা ব্যবস্থা , স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইত্যাদি হল উন্নয়নের মাপকাঠি। অতি সম্প্রতি বিশেষজ্ঞরা তথাকথিত উন্নত দেশগুলিকে প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তারা ব্যবহার করেছে মানব উন্নয়ন বা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট শব্দটিকে। অর্থাৎ যে সমাজে মানুষের উন্নতি ঘটবে সেটাই হবে, উন্নয়নের মূল মাপকাঠি। সমাজের মানুষের সুরক্ষা, সামাজিকীকরণ, বিভিন্ন অধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি হল উন্নয়নের মাপকাঠি। তাই, গ্রামীণ ভারতে কত কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, কত কিলোমিটার রাস্তা হচ্ছে, কত টাকার লাভ করলেন গ্রামবাসী – এগুলি উন্নয়নের শেষ কথা বলে না। বরং সরকারী প্রকল্পগুলিতে যদি সাধারন মানুষের ইচ্ছা, উৎসাহ, অংশগ্রহন জড়িত থাকে , তবেই সূচনা হবে প্রকৃত উন্নয়নের। পাশাপাশি সাধারন মানুষের কোনরূপ অভিযোগ করার সুযোগ থাকলে, তবেই মসৃণ হবে  উন্নয়নের রাস্তা। আর এই ভাবনা থেকেই গ্রামসভা নামক সভাতে গ্রাম পঞ্চায়েত ও সাধারন মানুষকে একই প্লাটফর্মে আনা হচ্ছে , যার মাধ্যমে সমবেত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে গ্রামের উন্নয়নের ভাবনা ভাববে গ্রামবাসীরাই।

গ্রামসভার উদ্দেশ্য পরিষ্কার ও সোজা সাপটা হলেও বেশ কিছু কারনে এর যথাযথ প্রয়োগে বাধা আসে। যথা-
১/ রাজনৈতিক ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গের প্রভাবে গ্রামসভার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।
২/ গ্রাম পঞ্চায়েত ও সরকারী প্রকল্পের প্রতি সাধারন মানুষের বিমুখ মনোভাব
৩/ গ্রাম সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহনে সদিচ্ছার অভাব

উপরোক্ত বিষয়গুলি অল্প সংখ্যক ও ছোট হলেও অত্যন্ত ক্ষতিকর যা গ্রামসভার মূল মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিচ্ছে। এগুলো নস্যাৎ করে দিতে পারলেই , সাধারন গ্রামবাসী সমবেত ভাবে গ্রামীন উন্নয়নে নিজেদের সামিল করবে এবং উন্নয়নের সঠিক দিশা খুজে পাওয়া যাবে।

Monday, 21 September 2015

হাওড়া থেকে কালকা, : একটি সমাজতাত্বিক আলোচনা

পিছিয়ে পরা রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ যে একটি, সে বিষয়টা জানা সবারই. তবে জনবহুল রেল স্টেশন হাওড়া থেকে কালকা মেলে উঠলে টেম্পারটা টের পাওয়া যায়. এমনিতেই রাজধানী যায়, তার ওপর বাঙালির প্রিয় বরফের জায়গা সিমলা মানালী যাবার জনপ্রিয় ট্রেন. তাই, শ্রেনীহীন মানুষের উপস্থিতিতে ট্রেন বাঁশী বাজিয়ে যাত্রা শুরু করে.
অখণ্ড বিহারের বিভিন্ন রাজ্যের ওপর দিয়ে গেলে ট্রেনের রংটাই বদলে যেতে থাকে. ভারতবর্ষ নামক বিশালাকার বিল্ডিংয়ের বহু পুরাতন চুন সুড়কির গাঁথনিটা দেখা যায়.সপ্ন দেখার মাঝে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়. অপুষ্টির বোমা, জাত পাতের গুলি, নারী দুর্দশার কামান - সবকিছু একসাথে এক অদ্ভুত সমাজের ছবি তুলে ধরে.
একটু নজর দিলেই বোঝা যায়, এই মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকালে কিছুতেই নীতিশ, লালু কিংবা রাবরীকে খুঁজে পাবে না, বরং সব্বাই দশরথ মাঝির প্রতিনিধি যারা দিশেহারা হয়েছে বটে, কিন্তু দম্ আছে খালি পেট নিয়ে আরো একটা পাহাড় কেটে দিতে পারার.
রুক্ষ মাটি ও খড়খড়ে আবহে এরা পিছিয়ে পড়া ভারতবাসী, মহিলারা চকমকে কাপড়ের ঘোমটা টেনে রুগ্নতা ঢাকে, বাবার বয়সী স্বামী এদের জীবনসঙ্গী, ধুলোর সাথে গড়াগড়ি দেওয়ায় এদের গরিবী- সবকিছু নিয়েই এরা গর্বিত বিহারী.
ট্রেন এগোলেই এদের আরেক সঙ্গী উত্তর প্রদেশ. খুব বেশী পার্থক্য করা যাবে না. নোংরা রাস্তা ঘাট, পচা খাল, পশুর মতো মানুষের বেঁচে থাকা. তবে, পশ্চিমবঙ্গের ও বিহারের সাথে একটা বড় পার্থক্য আছে এই রাজ্যটির, তা হলো ধর্মীয় বিবাদ. সেটাই মনে হয় এই রাজ্যের সব থেকে বড় রোগ. কারণ, বিবেকানন্দ শিকাগোতে বক্তৃতা দেবার সময় ভারতবাসীর নেতিবাচক দিকগুলি উঁচু গলায় বলেছিলো, তার মধ্য কোথাও এমন বিবাদের কথা বলেননি.
ধীরে ধীরে যখন দিল্লী ঢুকবে ট্রেন, তখন চিত্রটা কিছুটা বদলে রাজধানী গন্ধ আসবে, কিন্তু সেই তৃতীয় বিশ্বের প্রমাণ থেকেই যায়.
কোনক্রমে দিল্লী পেরিয়ে হিমাচল প্রদেশে ঢুকতে ঢুকতেই নতুন ভারতের গন্ধ পাওয়া যাবে, যে গন্ধ মিলবে পার্লামেন্টের ঘরে, যে গন্ধ মিলবে পার্টি ওফিসের প্রেস রুমে, -এখানে শান্ত ভারতবর্ষ, এখানে চামড়ায় ঠান্ডা হাওয়া লাগে, এখানে ক্রিমিনাল সাংসদরাও উঁচু মাপের ভারতীয়, এখানে সংবিধান বলে একটা বই আছে, এখানে রাইট ট্যু ইনফরমেশন বলে একটা ব্যপক আইন আছে, এখানে ফেমিনিস্টরা লড়াই করেন সিংগল মাদারের জন্য, এখানে রাজনীতি নিয়ে বই লেখা হয়. বরফ ও ঠান্ডা ভুলিয়ে দেয় বাকি ভারতবর্ষের কথা, ভাবতে শুরু করি কিভাবে বাথটবে শুয়ে সুখ পাওয়া যাবে সব থেকে বেশী.
কালকা মেল ট্রেনটি শুধু একটা যোগাযোগের মাধ্যম নয়, আমাদের কাছে ভারতবর্ষ চিনে নেবার এক জার্নি যা পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে, বিহার - উত্তর প্রদেশ, দিল্লী,সব কিছু দেখিয়ে  সবশেষে আবার এসবকিছু ভুলিয়ে দেয় হিমাচল প্রদেশে. ভুলবো তো সবই, শুধু মনে রাখা প্রয়োজন ঠান্ডা ও বরফ যতই আমাদের সুখের পর্যায়কে উঁচুতে নিয়ে যাক, ফিরতে হবে বাড়ি আর দেখতে হবে সেই উত্তর প্রদেশের মানুষ, বিহারের আবহাওয়া এবং ফিরে গিয়ে সেই পশ্চিমবঙ্গের নিত্যদিন. আরও একবার এঁকে ফেলবো ভারতবর্ষের সামাজিক রূপরেখা.

Sunday, 20 September 2015

সমাজতত্ত্ব পাঠে ইংরিজী ভাষা

সমাজতত্ত্ব বিষয়টি পৃথক পৃথক সমাজের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনা হয়. এমনকি আলাদা ভাষা ভাষী মানুষের কাছেও এর আলোচনার ধরন বদলে যায়; তবে আমরা বাঙ্গালীরা কেন শুধু বাঙ্গলা ভাষাতে এর চর্চা করবো না ???
প্রশ্নটা খুব সাধারণ এবং প্রাসঙ্গিক...
আমাদের দেশে এত বাঙ্গালী সমাজতাত্বিক থাকায় এই দাবীটি খুব স্বাভাবিক.
কিন্তু, তা সম্ভব নয় বলেই, আমরা বাঙ্গলা সমাজতত্ত্ব চর্চার পাশাপাশি ইংরিজিতে বিষয়টির চর্চা করবো, কারন নিম্নলিখিত :-
1) নবীন বিষয় হিসেবে এর বিস্তার এতটাই কম যে, একটা বিস্তৃত আলোচনা ও চর্চার জন্য আমাদের ছাত্র ও পণ্ডিতের সংখ্যা এতটাই কম যে, সঠিকভাবে করার জন্য অন্য ভাষার পণ্ডিতদের ডাকতে হয়. এই সমস্যা কিন্তু ইতিহাস বা ভূগোলের নেই. তাই, একটা মাধ্যম হিসেবে ইংরিজি ব্যবহার করতে হয়.
2) বিদেশী বইগুলো এখনো সঠিক ও উন্নতমানের অনুবাদ হয়নি, ফলতঃ আমাদের সঠিক পড়াশুনার জন্য সরাসরি ইংরিজি বই পড়তে হবে. যেমন, কার্ল মার্কসের বই জার্মানী ভাষায় পড়ার দরকার নেই, উন্নতমানের অনুবাদ ইংরিজিতে আছে.  কিন্তু বাংলার অনুবাদ ভালো নেই.
3) সমাজতত্ত্ব খুব বেশী প্রাত্যহিক দিনকালের সাথে যুক্ত এবং এখনকার ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ইংরিজিতে পড়াশুনার জায়গা প্রস্তুত করে রাখা উচিত.

কিন্তু, কেন শুধু ইংরিজিতে সমাজতত্ত্ব পড়ব না ???
কারন, সমাজতত্ত্ব পড়া মানে এর বুলি আওড়ানো ও পয়সা ইনকাম নয়, আমাদের দায়িত্ব  সমাজকে নিয়ে ব্যাখ্যা করা ও ভাবা এবং সামাজিক সমস্যা গুলো নিয়ে সমাধানের পথ দেখানোতে সাহায্য করা.
তাই, নিজস্ব ভাষাতে সমাজতত্ত্ব না জানলে, আমরা কখনই নিজের সমাজতত্ত্ব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যাগুলো নিজের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারব না.

সর্বশেষে, এটা বলা যায় যে ইংরিজিতে সমাজতত্ত্ব পড়ে, চর্চা করে আমাদের মূল উদ্দেশ্য বাংলা ভাষায় সহজ সমাজতত্ত্ব নিজের মানুষের কাছে পরিবেশন করা.
আজ যদি আমরা এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি, তবে পরবর্তী প্রজন্ম আরও সহজ করে সরাসরি বাংলায় সমাজতত্ত্ব পড়তে পারবে হয়তো.

Friday, 18 September 2015

ক্ষমতায়ন ও সশক্তিকরণ

পিছিয়ে পরা মানুষের দল তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লড়াই চালাচ্ছে। হঠাত, করে এই প্রবণতাই সমাজে অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।
মাতৃভূমি নামক ট্রেনকে মহিলারা নিজেদের আয়ত্তে করে রাখা , গুজরাটে প্যাটেল সম্প্রদায়ের অনগ্রসর হওয়ার দাবী, বিরোধী দলের হরতাল-বিক্ষোভ-বনধ ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের প্রমান করা। 
সর্বত্র পিছিয়ে পরা মানুষের নিজেদের প্রমানের জন্য শক্তিপ্রদর্শন
মনে রাখতে হবে, শক্তি প্রয়োগ করে নিজেদের ক্ষমতাশালী প্রমান করা যায়না। যদি তাই যেত, তবে সর্বদা ছড়ি ঘোরানো স্কুল টীচার-রাই সব থেকে শক্তিশালী হত. 
আর যারা সর্বদা নিজেদের 'জনগনের সেবায় রত', 'পাবলিক সার্ভেন্ট' ইত্যাদি বলা আমলা ও রাজনীতির ব্যক্তিরা ক্ষমতাশালী হত না। 
পিছিয়ে পরা মানুষকে এগিয়ে আসার জন্য সমাজে তাদের গুরুত্ব কে তুলে ধরতে হবে এবং নিজেকে নিজের প্রাসঙ্গিকতা গড়ে তুলতে হবে।