Thursday, 20 October 2016

বিকেল পাঁচটায় মাডওয়া ফেরী ঘাট থেকে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া যাওয়ার লঞ্চ ছাড়ার সময়ই দেখলাম- সূর্য নিজের রং বদল শুরু করেছে। হলুদ থেকে সোনালী, সোনালী থেকে গেরুয়া। পরিবর্তিত সূর্যের রং এরকম নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, রংবদলের কারণ নিশ্চতভাবে বলা যায় - সূর্যাস্ত।
এক ঘন্টা যাত্রাসময় পেরিয়ে যেতেই, দেখা গেলো সূর্য নিজের রং বদলের সাথে সাথে ক্লান্ত শরীরে খুব ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে সমুদ্র ধারের বহুতল টাওয়ার গুলোর ওপরে। লঞ্চের মুহুর্মুহু গতিপথ বদলের সাথে সাথে সূর্যের ঢলে পড়ার প্রক্রিয়া আরব সাগরের আকাশে অদ্ভুত সৌন্দর্য সৃষ্টি করছে। বহুতল টাওয়ার গুলি যেন প্রজ্বলিত সূর্যটিকে নিয়ে ভলিবল খেলছে। আর সাগরের জলরাশি ঢেউ তুলে হাততালি দিচ্ছে।
অদ্ভুত সৌন্দর্যের খেলায় সবাই যখন মত্ত, সাগরপাড়ে "তাজ হোটেল" ও "গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া" দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচিয়ে। ঠিক যেন সৌন্দর্য উপভোগে বিশেষ অতিথি হয়ে উপস্থিত হয়েছে এক রাজা ও এক রানী। হাজার সূর্য ডুবে গেলেও এই রাজা রানীর গরিমা জেগে থাকবে স্ট্রিট লাইটের টিমটিমে হলুদ আলোয়, মুম্বাইবাসীর মিশ্র সংস্কৃতির পথেঘাটে, দুহাজার বছরের ইতিহাসে আর ভ্রমণকারীদের হাজার হাজার ক্যামেরার লেন্সে।

Thursday, 3 March 2016

তোমার ছবি স্থির
তোমার ছবিতে রক্ত চলা চল
তোমার দৃষ্টি ধীর
তোমার দৃষ্টি থাকে অবিচল
আঙ্গুলের ফাঁকে
গোলাপী ঠোঁট বিস্তৃত হয়
অনুভূতির বাঁকে
সময়ের গতি বদলে যায়
তবু তোমার জয়
আমার বুকে জয়ধ্বনি দেয়
যেটা তোমার নয়
সেটা মুছে দিতে ইচ্ছে হয়

Saturday, 20 February 2016

ভাষার উপাদান

সভ্যতার আধুনিকীকরণের সাথে সাথে আমরা অনেক কিছু পাওয়ার মাঝে বেশ কিছু হারাতে শুরু করি যেগুলো আসলে অদ্বিতীয় সামাজিক উপাদান!!! অত্যাধুনিক ডিজিটাল ও প্রিন্টিং গণমাধ্যমের গ্রাসে - ব্যস্ত জীবনযাত্রার আঙ্গিনায় আমরা রোবটের মতো হয়ে উঠছি!!! আমাদের চারদিকে "হাতে লেখা পোস্টার", "জলজ্যান্ত পারফর্মেন্স- নাটক", "সুরেলা ধীরগতির গান" ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়গুলি প্রায় অবলুপ্ত!!!
আমরা কি সত্যিই এগুলো পছন্দ করিনা নাকি কেবলমাত্র কিছু মানুষের ব্যবস্যাভিত্তিক চতুরতার কাছে ইচ্ছেগুলো বিকিয়ে দিচ্ছি!!! যাই হোক্ বাস্তবে, আমরা জানি আমাদের শহরে এখনও হাওয়ার সাথে "আবেগ" মিশে থাকে!!! শহরের  হেরিটেজ হিসেবে কিছু পুরনো বাড়ি দেখা যায়!!! আর সেই বাড়ির ও আশেপাশের মানুষ, নাটক,কবিতা, গান, শিল্প চর্চায় সদা মগ্ন!!!
আন্তর্জাতিক ভাষাদিবসের প্রাক্কালে এইসব মানুষকে বদলে না যাবার আহ্বান জানাই!!! এরাই সকলে এই ভাষা ও ভাষার উপাদানকে বহন করবে!!! #theatre #heritage #photography #kolkata

দেওয়াল লিখন:

ইহা একটি এমন বিশেষ শিল্পকর্ম যাহা হইতে কোন সমাজ চিত্র তো বটেই, এমনকি ইহা হইতে জাতিগত গুণাবলী বুঝিতে কোন ব্যক্তির অসুবিধা হয়না!!! তাই, কোন আদর্শ  ভ্রমণ পিপাসু সমাজতাত্বিক যখনই কখনো হাওয়া বদলের উদ্দেশ্য লইয়া নিজের গন্ডি ছাড়িয়া বাহির হয়, তখনই দু চোখ মেলিয়া ধরিয়া খুঁজিতে থাকে, সেই জায়গার দেওয়াল লিখনগুলি!!! তাহাদের রং, বর্ণ, কারুকার্যের ধরন, ভাষার প্রয়োগ, অশ্লীলতার প্রয়োগ, ব্যবহৃত পুরুষ বা নারীর ছবি ইত্যাদি ইত্যাদি!!! পশ্চিমবঙ্গ অন্তর্গত দেওয়াল লিখনের সহিত ওড়িশার দেওয়াল লিখন বিস্তর ফারাক! উত্তর বঙ্গের সাথে বাকি বঙ্গের, নাটকের সাথে সিনেমার, মলমের সাথে কলমের, এমনকি বাংলার সাথে অন্য ভাষার দেওয়াল লিখনের পার্থক্য চোখে পড়িবার মতো!!
দেওয়াল লিখনের আঞ্চলিকতা ও আন্তর্জাতিকতা রইযাছে!!! যথা - কোন লিখনে যদি আঞ্চলিক শব্দের আধিক্য থাকে, তাহা কেবল ওই এলাকায় লিখিবার মতো! যদি কোন লিখন একের অধিক স্থানে চালাইতে হয়, তবে তাহার বিস্তার অধিক হইয়া ওঠে এবং দেওয়াল লিখন সেই অনুযায়ী করিতে হয়!!
আবার কখনো কখনো দুইয়ের মিলন ঘটিয়া থাকে! যেমন সেদিন দেখিলাম দুনিয়া কাঁপানো মারণ রোগ সোয়াইন ফ্লু শব্দখানি  লইয়া কোন এক নাট্যদল তাহাদিগের মদ পানীয়ের বিষয়ক এক প্রযোজনার নামকরণ করিয়াছে ওয়াইন ফ্লু!!! নাটকটির আঞ্চলিকতাতে যেভাবে আন্তর্জাতিকতাকে প্রয়োগ করিয়া দেওয়াল লিখন করিয়াছে, তাহা যথেষ্ট আনন্দ দায়ক ও শিল্পসত্ত্বার প্রকাশ বলিয়াই গণ্য হইবে!
যুগ যুগ ধরিয়া চলমান এই শিল্পকে সর্বাধিক পুষ্ট ও তুষ্ট করিয়াছে "ভোট"! রাজনীতিতে নিজেদের শক্তি বজায় রাখিবার জন্য, দেওয়াল দেওয়াল জুড়িয়া মিথ্যা কথা বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি লিখিয়া রাখা একধরনের শিল্পের প্রকাশ!
সবকিছু মিলাইয়া আমরা দেওয়াল লেখার জাতি ভালোই আছি লিখিয়া ও পড়িয়া!!!

Thursday, 10 December 2015

কান্নার রং বদল

জানি : মতামত দিয়ে কিছুই বদলে দেওয়া যায়নি কখনো!
তবু : এই লেখাটা লিখতেই হচ্ছে,
কোটি কোটি মানুষের মন জয় করা, নায়ক সলমন খানকে ঘৃণা করার জন্য যুক্তি সাজাতে হয়না, শুধু  মানুষ(গাড়ির তলায় চাপা পড়া) কিংবা নিদেনপক্ষে জানোয়ার(হরিণ) হলেও হয়!! যদি তাও না হয়, তবে তো বলতে কোন বাঁধা নেই "আরে ভাই, আমি সিনেমা দেখি! ওর শিল্পী সত্তাকে কুর্নিশ জানাই! আমি ওর ফ্যান! কি দেখতে! কি নাচে! উফ্, হিরো".

বেকসুর খালাস হবার আনন্দে পার্টি হবে, মদ্য পান হবে, তারপর গাড়ি চালাতে বেড়াবেন সলমন!!! ওই গাড়ির তলায় কে কে আসবে, তা নিজেরাই ঠিক করে নাও. ঠিক আছে ???

নাহলে, সলমন খানের কোন দোষ থাকবে না কিন্তু!!
তোমরা যদি সাহায্য না করো, সলমন খান নিজের ইচ্ছে মতো ঘুমন্ত মানুষ পিষে দিয়ে এমনভাবে মানুষ মারবে, যেন কোন সিনেমার মারকুটে সিন!!!
আর, এই কাজের জন্য আদালত ডাকবে এবং সেই আদালত থেকে কেস জিতে নায়ক এমনভাবে বেরিয়ে আসবে যেন সিনেমার শেষ সিন! দর্শক জেতার আনন্দে কাঁদবে!

কেউ কেউ আবার কাঁদবে গাড়িতে চাপা পড়েও,  আদালতে মিথ্যেবাদী প্রমাণিত হয়ে!!!

আমরা আদালত না, আমরা প্রশাসন না কিংবা আমরা পুলিশ না !!!
কিন্তু আমরা প্রতিক্রিয়াশীল!!! আমরা কিছু খারাপ দেখলে কোথাও না হোক, মনের "পুলিশ" দিয়ে গ্রেপ্তার করে ফেলতে পারি মনে মনে! নিজের আত্ম-প্রশাসন ওই খারাপকে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী হতে পারে এবং বিবেকের আদালত তার বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি দিতে পারে!!
একটাই শাস্তি - REJECT
নিজের জীবনের ভালো লাগার লিস্টে সলমন-এর কোন কিছু থাকবে না!!

Wednesday, 2 December 2015

জানালার শহর

শহরের উপকণ্ঠে আমার শহর,
সূর্য ওঠার কয়েক ঘন্টা পরেই জেগে ওঠে!
রাতের নিশ্চুপ একাকীত্ব গুলো,
নিজেকেই নিজে হারিয়ে ফেলে এই সকালবেলা!
বিছানার কোল ছেড়ে একটু সরে,
ঘুমভাঙা চোখে নিজের থুতনি রাখি জানলায়,
চোখের দৃষ্টি চলে যায় রাস্তায়,
ঘাড় কাঁত করে তাঁকিয়ে থাকি রাস্তার দিকে!
ওরা বুঝি অন্য গ্রহের জীব,
মানুষের থেকে চলমান গাড়ির সংখ্যা বেশী!
পিঁপড়ের মতো মানুষ গুলো,
আর দেশলাই বাক্সের মতো গাড়ি গুলো নড়ছে!
থেমে থাকতে নেই ওদের কারো,
ওদের গতি আমার হৃদপিন্ড থেকেও বেশী!
ছুটতে থাকা এই শহরের থেকে,
আমি ছুটে পালাতে চাই দূর থেকে আরো দূরে!
আমি গতিহীন এক নিশ্চুপ ভাবনা,
আমার থমকে যাওযাই জন্ম দেয় ভাবনার গতিকে!
তবু শহরের ব্যস্ততা বিলীন হয়,
আমার ইচ্ছার চৌকাঠের একটু দূরে!

Thursday, 26 November 2015

গ্রাম সভা ও তার সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

সময়ের সাথে সাথে আমাদের সমাজ যতই জটিল ও সমস্যাযুক্ত হয়ে উঠছে , মানুষ ততটাই দ্রুততার সাথে এইসব সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হয়ে উঠছে। এই উদ্যোগের উজ্জ্বল ফল হল গ্রামীণ ভারতে গ্রাম সভার আয়োজন। কল্যাণকারী রাষ্ট্র ভারতবর্ষের সরকার যেসব প্রকল্প গ্রামীণ মানুষের উদ্দেশ্যে চালু রেখেছে তার সচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও ফলপ্রসূতা নিশ্চিত করতে সাধারন গ্রামবাসীকে গ্রাম পঞ্চায়েতের মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়াই হল গ্রাম সভা। ঠিক যেন এক তৃনমূল স্তরের গ্রামীণ পার্লামেন্ট , যেখানে আলোচনা, তর্ক বিতর্ক, অভিযোগ, আদেশ, প্রস্তাব পেশ হয় খোলা মেলা ভাবে। অর্থাৎ গ্রাম সভার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল নিম্নলিখিত –

১/গ্রামের আধিকাংশ মানুষের ধর্ম-লিঙ্গ-রাজনীতি নির্বিশেষে উপস্থিতি
২/আলোচনা হবে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া বা চালু প্রকল্পগুলির অগ্রগতি সম্পর্কে
৩/ভবিস্যতে নতুন নেওয়া হবে যেসব সরকারি প্রকল্প , তার প্রস্তাব গ্রহন
৪/ সাধারন মানুষের অভিযোগ-উপদেশ শোনা এবং গ্রাম পঞ্চায়েত ও জন প্রতিনিধি দ্বারা স্পষ্ট প্রত্তুত্তর
৫/সম্পূর্ণ সভাটির প্রতিটি পদক্ষেপকে লিপিবদ্ধ করা হয় যাতে তার ভিত্তি্তে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহন করতে বাধ্য থাকে।

ভারতবর্ষের অধিকাংশ অংশটি গ্রামীন, তাই জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর পাখির চোখ ছিল গ্রামীন ভারতের উন্নয়ন। এমনকি স্বাধীনতার পরের ভারতে বিভিন্ন উন্নয়নের ভাবনা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সহ সমস্ত ক্ষেত্রেই প্রকল্প রুপায়নকারীরা গুরুত্ব দিয়েছে এই গ্রামীণ ভারতকেই। অর্থনৈতিকবিদরা শহুরে ভারত ও গ্রামীন ভারতের বিপরীতমুখী চরিত্রকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, গ্রামীণ ভারত সর্বদা বঞ্চিত থেকেছে। প্রতিটি বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকার গ্রামীন উন্নয়নে ক্রমবর্দ্ধমান অর্থ বরাদ্দ করলেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। গ্রামীণ ভারতের স্বার্থে চালু হওয়া মূল প্রকল্পগুলি হল- এম জি এন আর ই জি এ , আই এ অয়াই , আর এস বি অয়াই , এন এস এ পি, সহায়, স্বচ্ছ ভারত কর্মসূচী ইত্যাদি।

সরকার থেকে একটি মানুষের , পরিবারের সমস্ত ভাবে বেচে থাকার রসদ জুগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবুও সাধারন মানুষের কাছে এই প্রজ্বলিত আলোর শিখা পৌছাতে ব্যর্থ হয়েছে। স্বাধীনতার পর ৬৮ বছর পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, অধিকাংশ গ্রামীন ভারত কর্মহীন, গৃহহীন , শিক্ষাহীন, গরীব, চিকিৎসার সুযোগ পেতে ব্যর্থ। কারন হিসেবে বলা যায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে-
১/ দুর্নীতি রোধ করতে না পারায় প্রকল্পগুলিতে খরচ হয়েছে, কিন্তু পরিষেবা দেওয়া যায়নি
২/ পরিকল্পনার ভুল বিন্যাস সরকারী প্রকল্পকে দিশাহীন করেছে।
৩/ সাধারন মানুষকে প্রকল্প সম্পর্কে সঠিকভাবে জানানো যায়নি, ফলে তারা এগিয়ে আসেনি।
৪/ প্রকল্প রুপায়নকারী সংস্থা, যথা-গ্রাম পঞ্চায়েতর সদিচ্ছার অভাব থাকায়, প্রকল্পগুলি ব্যর্থ হয়েছে।
৫/ সাধারন মানুষের মতামত জানা বা শোনা হয়নি যা যেকোনো প্রকল্পের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হতে পারতো।
এইসব দিকগুলি মাথায় রেখে সমস্যা সমাধানের যে চেষ্টা বহুদিন ধরে চালাচ্ছিল পরিকল্পনা রুপায়নকারীরা , তারই ফল হল গ্রাম সভা।

স্বাধীনতার পর গ্রামীন সমাজের উন্নয়ন ও এই উন্নয়নের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য গ্রাম সভা চালু হওয়া – গোটা বিষয়টির সমাজতাত্ত্বিক ব্যখ্যা করতে হলে, দুটি দিক উঠে আসে যা গ্রাম সভার আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

গ্রাম সভা হল গোটা সমাজ ব্যবস্থার একটি অঙ্গ , কারন ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রয়েছে লোকসভা যার মধ্যে ভারতের সমাজ পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর, রাজ্য গুলিতে বিধানসভা আছে যেখানে রাজ্য পরিচালনার দিশা নির্দিষ্ট করা হয়। সর্বশেষে গ্রামের গ্রাম সভা রয়েছে যেখানে ওই নির্দিষ্ট গ্রামটির উন্নতির বিষয়ে আলোচনা করা হয়। অর্থাৎ সাংসদ, বিধায়কদের মতই গ্রাম সভার সদস্য হল সাধারন গ্রামবাসী। 

গ্রামসভার ঐতিহাসিক উৎসটি যদি সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা হয় তবে বোঝা যাবে যে দীর্ঘ দিনের বহু ভাবনার ফলে এই গ্রাম সভার উৎপত্তি। সমাজের মূল বৈশিষ্ট্যই হল পরিবর্তনশীলতা। সারা পৃথিবীতে পরিবর্তনশীলতার উদাহরন হিসেবে সর্বপ্রথম ফরাসী বিপ্লব ও শিল্প বিপ্লব হয়েছিল। এইসব বিপ্লবের কোলেই জন্ম নিয়েছিলো সমাজতত্ত্ব বিষয়টি, যার পিতা অগাস্ত কোঁত। কিন্তু ভারতে এই পরিবর্তনশীলতার প্রথম উল্লেখযোগ্য উদাহরন হল ব্রিটিশের উপনিবেশ স্থাপন। যার ফলে রাজা ও রাজার সাম্রজ্য ব্যবস্থাটি বদলে যেতে থাকে জমিদারী ব্যবস্থায়। এই জমিদারী ব্যবস্থার অবসান ঘটে পরবর্তীকালে, অর্থাৎ স্বাধীনতার কিছুবছর পর। মাঝের সময় নকশাল সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটে। বর্তমানে পৃথিবীর বৃহত্তম গনতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে ভারতবর্ষের নাম গৃহীত হয়েছে। একটু লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, সবগুলি সমাজের ব্যবস্থাই বা সমাজের অবস্থাই ব্যর্থ হয়ে অন্য ব্যবস্থা বা অবস্থাতে পরিবর্তিত হতে বাধ্য হয়েছে। আর সবকটির মূলত একটিই কারন- সাধারন মানুষের কণ্ঠ রোধ করেছে ওই ব্যবস্থাগুলি। আর এই জায়গা থেকেই গ্রাম সভার ভাবনা শুরু। বর্তমানের ভারতবর্ষের প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা তথা গনতন্ত্রের ব্যবস্থার মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান আছে, বিশাল পুলিশ বাহিনী আছে, সক্রিয় ও সহজলভ্য আইন ও আদালত আছে। মানুষের অধিকারের কথা মাথায় রেখে কর্ম সুনিশ্চিতকরন আইন, শিক্ষার অধিকার আইন, খাদ্য সুরক্ষা আইন, তথ্য জানার অধিকার আইন, ক্রেতা সুরক্ষা আইন ইত্যাদি প্রচলিত আছে। তবুও আমরা জানি বেকার সমস্যা, শিক্ষাহীনতা, অনাহার, বিচারের সুযোগ না পাওয়া, আমাদের দেশের সাধারন চিত্র। তাই সরকারের দায়বদ্ধতা ও মানুষের কণ্ঠের গুরুত্বকে সুনিশ্চিত করতে গ্রাম সভার ভাবনা।

উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও গ্রাম সভার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজন। সমাজতাত্ত্বিকের উন্নয়ন বিষয়টিকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। পূর্বে উন্নয়নের ধারনা ছিল পরিকাঠামো অর্থাৎ চওড়া রাস্তা, উঁচু ফ্লাই ওভার, বিশাল অট্টালিকা ইত্যাদি। কিন্তু পরবর্তী সময় পরিষেবার বিষয়টি সমাজের উন্নয়নে যুক্ত হয়। সরকার প্রদত্ত পানীয় জল, শিক্ষা ব্যবস্থা , স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইত্যাদি হল উন্নয়নের মাপকাঠি। অতি সম্প্রতি বিশেষজ্ঞরা তথাকথিত উন্নত দেশগুলিকে প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তারা ব্যবহার করেছে মানব উন্নয়ন বা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট শব্দটিকে। অর্থাৎ যে সমাজে মানুষের উন্নতি ঘটবে সেটাই হবে, উন্নয়নের মূল মাপকাঠি। সমাজের মানুষের সুরক্ষা, সামাজিকীকরণ, বিভিন্ন অধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি হল উন্নয়নের মাপকাঠি। তাই, গ্রামীণ ভারতে কত কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, কত কিলোমিটার রাস্তা হচ্ছে, কত টাকার লাভ করলেন গ্রামবাসী – এগুলি উন্নয়নের শেষ কথা বলে না। বরং সরকারী প্রকল্পগুলিতে যদি সাধারন মানুষের ইচ্ছা, উৎসাহ, অংশগ্রহন জড়িত থাকে , তবেই সূচনা হবে প্রকৃত উন্নয়নের। পাশাপাশি সাধারন মানুষের কোনরূপ অভিযোগ করার সুযোগ থাকলে, তবেই মসৃণ হবে  উন্নয়নের রাস্তা। আর এই ভাবনা থেকেই গ্রামসভা নামক সভাতে গ্রাম পঞ্চায়েত ও সাধারন মানুষকে একই প্লাটফর্মে আনা হচ্ছে , যার মাধ্যমে সমবেত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে গ্রামের উন্নয়নের ভাবনা ভাববে গ্রামবাসীরাই।

গ্রামসভার উদ্দেশ্য পরিষ্কার ও সোজা সাপটা হলেও বেশ কিছু কারনে এর যথাযথ প্রয়োগে বাধা আসে। যথা-
১/ রাজনৈতিক ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গের প্রভাবে গ্রামসভার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।
২/ গ্রাম পঞ্চায়েত ও সরকারী প্রকল্পের প্রতি সাধারন মানুষের বিমুখ মনোভাব
৩/ গ্রাম সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহনে সদিচ্ছার অভাব

উপরোক্ত বিষয়গুলি অল্প সংখ্যক ও ছোট হলেও অত্যন্ত ক্ষতিকর যা গ্রামসভার মূল মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিচ্ছে। এগুলো নস্যাৎ করে দিতে পারলেই , সাধারন গ্রামবাসী সমবেত ভাবে গ্রামীন উন্নয়নে নিজেদের সামিল করবে এবং উন্নয়নের সঠিক দিশা খুজে পাওয়া যাবে।